Monday, December 16, 2019

অমর মিত্র



                                               


                                           কুয়াশা

     [ প্রকাশিতব্য ‘মোমেনশাহী উপাখ্যান’ উপন্যাসে কুয়াশাই প্রধান চরিত্র। কুয়াশাই নিয়ন্ত্রণ করেছে সব চরিত্রের ভূত-ভবিষ্যত। তার সামান্য অংশ এখানে রয়েছে।]  
   
      কুয়াশার সমুখে কুয়াশার কথা হচ্ছিল। বিপুল জিজ্ঞেস করে, আপনি পাহাড়ে কুয়াশা দেখেছিলেন ?
      অতীন বললেন, হ্যাঁ, আমি পাহাড়ে  ক্রমশ প্রলম্বিত  কুয়াশার জন্ম দেখেছি  মশায়, সেদিন রোদ ছিল না বটে, কিন্তু আলো ছিল, সব দিক দেখা যাচ্ছিল, আমি একা একা  পাহাড়ি পথে  চলেছি, আমার ইচ্ছে গারো রাজার দুর্গ দেখব, পাহাড়ে পৌঁছবার আগে পথে  এক বুড়ার সঙ্গে দেখা, সে বলল, যদি আমার যদি ইচ্ছে হয়, আমি নিজেই পথ খুঁজে পাব, পাহাড়ে পথে  রাজার পথ সব পথ, কেউ না কেউ এসে নিয়ে যাবে, কিংবা নিজেই চিনে নিতে পারব, আমি পাহাড়ি পথ ধরে পাহাড়ের ভিতরে প্রবেশ করেছি, কিন্তু কেউ ছিল না কোথাও, বনের ভিতর অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছিল।
    কেমন ছিল সেই পথ ?  পাথর আর মাটির সেই পথ ঘুরে ঘুরে অনেক উপরে উঠে গেছে। গাছের পরে গাছ। শাল, সেগুন, মহুয়া, গজারী, আকাশমণি, বাঁশ, বেত। শাল, সেগুন, মহুয়ার পাতা ঝরতে আরম্ভ করেছে। জঙ্গলের  নিষ্পত্র হওয়া আরম্ভ তখন। অনেক পাতা আছে অনেক পাতা নেই। পাতা ঝরছে, ঝরেই যাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে অনেক দূর। পাহাড়ে পাখির ডাক ছিল। পাতা ঝরার শব্দ ছিল। কার্তিকের শেষের  শীত ছিল ঝিমঝিমে।  অতীন নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন বনে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা কম, তাই। কিন্তু কেমন যেন মনে হচ্ছিল, কোন পথে যাবেন বুঝতে পারছিলেন না। একটা জলাশয় পড়ল পথে। হ্রদ। সেই হ্রদে প্রচুর পদ্ম ফুটেছিল। অতীন একটি পদ্ম সংগ্রহ করলেন। তারপর  চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলেন। পঁচাত্তর বছর আগে গারো পাহাড়ে ভূমিকম্প হয়েছিল তা জানা ছিল তাঁর। সেই ভূমিকম্পে একটা পাহাড় অদৃশ্য হয়ে গিয়ে হ্রদের জন্ম দিয়েছিল। সেই রেবরং লেকের কাছে এসে পৌঁছলেন নাকি ?  আবার হাঁটা শুরু করলেন। জনমনিষ্যি নেই। কাঠুরেরা নেই যে পথ জিজ্ঞেস করে নেবেন।  ধীরে ধীরে নিস্তব্ধতা বেড়ে যাচ্ছিল। অত উপরে পাখিরা ছিল না। পাখির ডাক থেমে গিয়েছিল। তখন তিনি টের পেলেন অনেক উপরে উঠে এসেছেন। সেই সময় অবাক হয়ে দেখতে পান সামনে কুয়াশা জমে আছে। বনের ভিতর থেকে কুয়াশা যেন ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। কুয়াশার রঙ মেঘের মতো। মেঘের রঙ হাতির মতো।কুয়াশা ছেয়ে ফেলতে লাগল বন। এতটা সময় সব দিক ছিল স্পষ্ট। এবার সব অস্পষ্ট হয়ে যেতে লাগল। তাঁকে ঢেকে ফেলল কুয়াশা। কুয়াশায় না প্রবেশ করে তাঁর উপায় ছিল না। কুয়াশার ভিতরে হাঁটতে লাগলেন তিনি অন্ধের মতো প্রায়। কত সময় হেঁটেছেন হিশেব নেই। তারপর আচমকা কুয়াশা নেই। স্তিমিত আলোয় দেখা গেল গারোরাজার দুর্গ। অতি বৃহৎ প্রাসাদ। কুয়াশা ঘেরা দেওয়াল,  লম্বায় অনেক। মনে হলো এক অতিকায়  মানুষ দুদিকে দীর্ঘ দু-হাত ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে।সেই মানুষের মুখ দুর্গের মুখ। সেই মুখে ঝিম ধরা নীরবতা। অতীন অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলেন। কুয়াশা ছিল না, আলো ছিল গোধুলীবেলার মতো। ছায়া ছায়া আলো বনের বাইরে বিস্তৃত। বন আছে দুর্গের পিছনে। বন আছে অনেকটা দূরে। বন যেন দুর্গটিকে ঘিরে ছিল। অতীন ঘুরে তাকালেন অনেক দূরে, যে পথে এসেছেন তিনি। মনে হলো সেই পথে আবার ফিরে যান। আবার মনে হলো ফিরে যাওয়া মানে এই আসা আর আসা হলো না। তিনি আকাশে তাকালেন। নীল, কত নীল তা তিনি বর্ণনা করতে পারবেন না।  অতীন বুঝতে পারলেন, গারো রাজার দুর্গে এসেছেন তিনি। প্রবেশ করতে হবে।
          দুর্গ , হ্যাঁ, দুর্গ। আমি এক দুর্গের সমুখে দাঁড়িয়ে ছিলাম। পাথর আর কাঠ দিয়ে নির্মাণ করা সেই দুর্গের গড়ন ছিল পুব দেশের প্যাগোডার মতো। কাঠের লম্বা বারান্দা। কাঠের কারুকাজ তাকিয়ে দেখার মতো। লতা পাতা, সাপ, ড্রাগন,  মেঘের স্তূপ, কত রকম অলঙ্করণ ছিল। রাজার বাড়ির জানালা দরজা খোলা ছিল। আমি সম্মোহিতের মতো প্রবেশ করলাম ধূসর দরজা দিয়ে। এখন মনে হয়, কুয়াশার ভিতর লুকিয়ে থাকে যে বাড়ি, তার দরজাও ছিল কুয়াশার পর্দা। তখন সেই পর্দা সরে গেছে। বুঝতে পারলাম কুয়াশার ধূসরতা ছিল দুর্গের প্রাচীর।  লম্বা এক পথ ছিল আমার সমুখে। সেই পথ আমাকে নিয়ে গেল রাজ দরবারে। দরবার খুব সাধারণ। একটি শূন্য আসন ব্যতীত ঘরে কিছুই ছিল না বলতে গেলে। আরো বলা যায় শূন্যতা ব্যতীত সেই ঘরে কিছুই ছিল না। মনে হচ্ছিল মহাশূন্যের ভিতরে প্রবেশ করেছি। প্রাসাদ আসলে নেই। মাথার উপরে কুয়াশার যে ছাদ, তার উপরে আকাশমন্ডল। চারপাশের দেওয়াল তো কুয়াশার আবরণ। সেই মহাশূন্যতার ভিতর  অতিবৃদ্ধ  এক গারো পুরুষ বসে ছিলেন লম্বা কুশনে। তাঁর দিকে তাকালেও  মনে হয় ঘর নেই, প্রাসাদ নেই, আছেন তিনি পরম শূন্যতায় একা একা।  তিনি কেমন ? অনতিউচ্চ এক বৃদ্ধ যাঁর কপাল অজস্র বলিরেখায় ভরা। বৃদ্ধ গাছের গায়ে যেমন বয়সের চিহ্ন ফোটে রেখায় রেখায়,  তেমনি। তাঁর গায়ে ছিল লাল, নীল, রঙিন আলোয়ান। পরনেও ছিল নীল পোশাক। মাথায় ছিল পাতার মুকুট। মুখখানিতে হাসি। আমার মনে হলো মানুষ নয়, এক বহুবর্ণ ফুল-পাতায় ভরা অচেনা বৃক্ষ।  তিনি আমাকে দেখে অবাক, বললেন, ময় ত আসিতে কহি নাই, তুমু কেডা হইস, এহেনে কাউর তো আসার কথা ছিল না ?
      আমি বললাম, আমি যে শুনলাম রাজার ডাক এসেছে।
      গারো রাজা বললেন, যাই হক আইসো, ভালো করিস, তুমু মোর পজা ?
      জ্বি , পজা।
      কেনে আইসো ?
      খান সেনা আসতেসে, গণ হত্যা হবে।
      হারায়ে যাবে কুয়াশায়। তিনি বললেন। হাসলেন আমার দিকে চেয়ে। সেই হাসি আমি ইহ জন্মে ভুলব না। চোখদুটি  প্রস্ফুটিত শাদা আলোর দুই বিন্দু, যেন মহাশূন্যের দুই তারা, দুই তারা যেন চেয়ে আছে পরস্পরের দিকে।আপনি ভাবুন একটি চোখ অন্য চোখের দিকে তাকিয়ে। এক চোখ অন্য চোখের দিকে চেয়ে হাসল।  সেই হাসি তখন আমার গায়ে ছড়িয়ে যেতে লাগল  হিম কিংবা বৃষ্টির ফোঁটার  মতো। তিনি হাত  তুলে ইঙ্গিতে আমাকে আসন নিতে বললেন।আমি একটি নিচু আসনে বসেছি। তিনি ব্যগ্র কন্ঠে  জিজ্ঞেস করলেন, সোমেশ্বর রাজা সন্ধি করতে পাঠাল, ময় জানি  একদিন কেউ আসব সোমেশ্বর পাঠকর  পস্তাব নিয়া, মোর শকতি সে বুঝি পারিসে।      
    জ্বি ! আমি বুঝতে পারলাম না।
    মুর  হস্তিবাহিনী  তখন প্রস্তুত ছিল না। বললেন গারো রাজা, হস্তিযূথ প্রস্তুত থাকলে সোমেশ্বর পাঠক পরাস্ত হয়ে ফিরে যেত কান্বকুব্জের পথে ।
    শোনা যায়, সোমেশ্বর পাঠক পরাস্ত করেছিলেন গারো রাজাকে।
    তিনি হাসলেন, মোর শকতির নিকট সে তুচ্ছ, মুই এখন বুঝি, এতকাল ধরে ময় রহি গিসি এই স্থলে, একা, ময় একা?
   আমি ঝুঁকে বললাম, একা কেন, রাজায় কি একা থাকে ?
  রাজায় একা থাকে, রাজায় পারে একা থাকতে, রাজার কেহ নাই, জন-মনিষ্যি নাই, রাজা জানে  তার নিজের কত শক্তি,  মহাশূন্যে একা থাকে তারারা, একা থাকার শক্তি আছে বলে পারে, নইলে ভয়ে তারা আকাশ ছেড়ে পলাত, আকাশ অন্ধকার হয়ে যেত,  তুমাদের ঐ  সোমেশ্বর পাঠকের লোক-লস্কর লাগে, মোর লাগে না, মুই একাই এত শত বছর রয়ে গেসি,
   আঁজ্ঞে, তিনি তো বেঁচে নেই। আমি বললাম, বহু শত বছর আগে গত হয়েছেন।
   নেই! প্রায় আর্তনাদ করে উঠলেন বৃদ্ধ, বিড়বিড় করতে লাগলেন,  ময় রইসি, সে নাই, আহা, আমি  সর্বত্যাগী রাজা, পাঠকেরে আমি রাজ্য দিয়া বসে আছি এই প্রাসাদে,  মুই তাতারা রাবুগার আশীব্বাদ পাইসি,  তিনি মুদের বড় ঠাকুর, তাতারা রাবুগা কইসেন তাই ময়  রাজা গোয়েরা মুর শোক  নিবেদন করলাম, তাইই কইসি ময়। বলতে বলতে বৃদ্ধ রাজা তাঁর চীবরের মতো গাত্র বস্ত্র দিয়ে চোখ মুছলেন, ময়  তো  হিংসা করিনাই,  ময়  নিজেও মেনে নিয়েসিলাম পরাজয়, সে দুর্গ অবধি না এসে নিচে নেমে গেল, হায় তার সঙ্গে আর দেখা হবে না ?  
          আমি বললাম, সাতশো বছর আগে তিনি এদেশে এসেছিলেন।
          সাতশো বছর! সেদিনের ব্যাপার, সে কার হাতে মরিসে ? গারো রাজা গোয়েরা  জিজ্ঞেস করলেন, পাকিস্তানি খান সেনা ?
          না,তিনি  বহুদিন আগে ছিলেন তিনি, বহুদিন আগে চলে গেছেন। আমি বললাম।
          তুমি তারে মরতি দেখিস ? গারো রাজা জিজ্ঞেস করলেন।
          না, আমি দেখব কী করে, আমার বয়ঃক্রম একবিংশতি মাত্তর।
          তবে যে বললে সে মরি গিইসে, মরিতে তুমু দেখ নাই  ?
          আমি বললাম, এত দিন কেউ বাঁচে না।
          ময়  কি বাঁচি নাই, ময়  কি মরি গিইসি ? জিজ্ঞেস করলেন বৃদ্ধ রাজা। অতীন চুপ করে থাকলেন।
          সোমেশ্বর পাঠক কি বানপ্রস্থে গিইসেন, এই পাহাড়ের দিকে চলা আইসেন ? বৃদ্ধ রাজা জিজ্ঞেস করলেন।
          অতীন বললেন, তাঁর জানা নেই। বলতে বলতে  মাথা নত করলেন। কেন না তিনি দেখছিলেন পরাস্ত রাজা বিজয়ী রাজার মৃত্যু সংবাদে শোকার্ত হয়েছেন। তাঁর ছিল মুন্ডিত মস্তক। গাত্র বস্ত্র গভীর কালচে লাল, মুখমন্ডলেও  অজস্র বলিরেখা, চক্ষুমণি জ্বলজ্বল করছে জলের ভিতর ঝাঁকের মাছের এক একটির  মতো।
        রাজা বললেন, হে সিমসাং নদী, আমার শোক  লইয়া যাও।  
         অতীন মোহমুগ্ধের মতো বললেন, শোক গ্রহণ করতা আমার আসা।
        হে বনর বাতাস, মোর দুঃখ নিয়া যাও। রাজা নিচু হয়ে বললেন।
        অতীন বললেন, আমি সব কথা জানাব।
          রাজা বললেন, মু একা মান্দি ( মানুষ), আমি কারে দিয়ে পাঠাব শোকবার্তা, হস্তিযূথে ডর লাগব মান্দিগনের।
          তিনি নেই। সোমেশ্বর সিংহের কথা আবার স্মরণ করালেন অতীন। 
         শোকের কথা কইসি বটে, কিন্তু  বিশ্বাস করি না, রাজা নাই মোর বিশ্বাস হয় না, এখন যুদ্ধ চলতেছে, খান সেনা যদি মুর রাজ্যে ঢুকে, ময় শেষ করি দিব হাতি পাঠায়ে, কুয়াশায় ঘিরে দিয়ে, কুয়াশা নামায়ে দিব জগতে।
          বিপুল বলল, এসেছিল তাহলে খান সেনা ?
          অতীন বললেন,  জানা নেই।
          বিপুল বলল, অস্থিরচন্দ্র বলল যে।
         জানিনে, আমারে গারো রাজা বললেন,  যা তা হলো  একবার আয়ুব খাঁর আমলে, আর্মি আসছে এই খবর পেয়ে  তিনিই হস্তিযূথ পাঠালেন সুসঙ্গতে।তিনি জানতেন আর্মি আসা মানে মানুষের সব্বোনাশ, অন্তত সেই আমলে,  রাজা তা-ই বিশ্বাস করেন, সোমেশ্বর পাঠক জয় করলেও রাজ্য আসলে তাঁর। সোমেশ্বর পাঠক তাঁর অধীনেই রাজা হয়ে আছেন। তাঁর অধিকার সাময়িক। প্রজা পালনে তাঁর নিজের অধিকার। প্রজার ভালো  মন্দে তিনিই তাদের দেখবেন। বিপদে রক্ষা করবেন।তিনি বললেন, খান সেনা আসার খবর তিনি পেয়েছিলেন বনের ্পঙ্খীর কাছে। বনের পঙ্খীরা পাহাড় থেকে উড়ে যায়, খবর নিয়ে আসে। সেই এক  পঙ্খী নাকি হলুদ পঙ্খী। হলুদ পঙ্খী খবর দিলে  তিনি  কুয়াশা নামিয়ে হস্তিসেনা পাঠিয়ে আয়ুবের  সেনাদের পরাস্ত করেছিলেন।    
     আপনি কোনো নারীকে দেখেননি সেখানে ? বিপুল জিজ্ঞেস করল।
     অতীন বললেন, না তিনিই একা, আর কেউ ছিল না, এক আশ্চর্য গোধুলিবেলায় তিনি বসেছিলেন। জানালা ছিল সেই ঘরে। বড় বড় দুটি। কিন্তু মনে হচ্ছিল জানালা, দেওয়াল কিছুই নেই যেন, বাইরে ঘন কুয়াশা,  কুয়াশার পারে কী ছিল তা দেখা যাচ্ছিল না। গারো রাজা বলছিলেন, আবার কুয়াশা নামিয়ে দিয়েছেন সুসঙ্গ থেকে পূর্ব ধলা, নেত্রকোনা পর্যন্ত, সমস্ত জায়গা ছেয়ে আছে নীরন্ধ্র কুয়াশায়, সেনা বাহিনীর সাধ্য কি সেই কুয়াশা ভেদ করে, সেনা বাহিনী  ফিরে যাবে, ভয় নেই। হাত তুলে অভয় দিলেন তিনি।
    এখন প্রতিদিন  কুয়াশা নামছে  কেন ? বিপুল জিজ্ঞেস করে।
   হয়তো এমন কিছু ঘটবে, ঘটতে পারে, তা ঘটতে পারছে না। অতীন বিড়বিড় করলেন, বড় বিপদ থেকে রক্ষা পেয়ে যাচ্ছে সুসঙ্গ দুর্গাপুর কিংবা  এর মানুষজন।
     আমার এখন মনে হচ্ছে প্রবুদ্ধ সুবুদ্ধ আসেনি, তাকে দ্যাখেনি গোপাল দাসও, সবই আপনার উপাখ্যানের কথা। 
     তারা তো পান্ডুলিপিতে আছে। বললেন অতীন, পাণ্ডুলিপি বলবে সব কথা। অতীন চুপ করে থাকলেন।  বিপুল ভাবছিল পান্ডুলিপিই সত্য। সুধীন্দ্র সোমের  পাণ্ডুলিপি ক্রমাগত দীর্ঘ হয়ে যাচ্ছে। সুধীন্দ্র  যতটা ভেবেছিলেন তার চেয়ে অনেক বেশি কথা এসে প্রবেশ করছে। দশ হাজার হয়ে যাচ্ছে এক লক্ষ। বিপুলের মনে হয়, সে যা খুঁজতে এসেছিল তার অনেক বেশি পেয়ে গেছে যেন। আরো আছে। মানুষের অদম্যতার কাহিনি শেষ হয় না।  কুয়াশার ভিতর থেকে তা ক্রমাগত বেরিয়ে আসতে থাকে। এই যে কুয়াশা, এর ফলে যে লোকটি ছুরি হাতে বেরিয়েছিল কারোর রক্ত দেখার নেশায়, যে ঘাতক ভেবেছিল শেষ করে দেবে নিরীহ পরিবারটিকে, যে শয়তান ভেবেছিল লুট করে আনবে যুবতিকে, সে কুয়াশায় ঘুরছে, পৌঁছতে পারছে না।  ঘাতকেরা  পথ হারিয়েছে। কত মৃত্যু দুয়ার থেকে ফিরে গেল।
    
                                                      #                       #  
     এবার সেই দিনের অন্য এক ঘটনার কথা বলি। এক  ব্যক্তির কথা বলি। এক   ব্যক্তি আসছিল পাহাড়ি পথে। হাঁটতে হাঁটতে  আচমকা দেখল কুয়াশা নেমে এল। দুর্ভেদ্য কুয়াশা। এক হাত দূরের কিছু দেখা যায় না। সে জানত এমনি হবে। এমনি হয়।  কুয়াশার ভিতরেই আত্মরক্ষা করেন  গারো  রাজা। কুয়াশার প্রাচীরের ভিতরই রয়েছে রাজার বাড়ি। গারো পাহাড় আর সিমসাং নদীর রাজার বাড়ি যাচ্ছে সে ।  সে অন্ধের মতো চলতে লাগল। গারো পাহাড়ে এক রাজার প্রাসাদ আছে, সে তাদের দেখতে এসেছে। দেখে ফিরে যাবে, আর কিছু না। মানুষ এমনি কত কিছু দেখে ফিরে যায়, সমুদ্র, হ্রদ, নদী, পাহাড়, জঙ্গল, সূর্যাস্ত, সূর্যোদয়, কত কিছু। এমনিই দেখে ফিরে যায়। সেও এমনি দেখে ফিরে যাবে কি যাবে না, তা পরের সিদ্ধান্ত। আর কিছু না। এই যে এত কুয়াশা, এমনি কুয়াশা এল কোথা থেকে, সে শুনেছিল, কুয়াশা পেরিয়ে যেতে হবে রাজার বাড়ি। কত পথ যেতে হবে, কত দূর তা জানে না লোকটি। সে নিজের মতোই চলছিল। ভুল না ঠিক পথ জানে না। কিন্তু যেতে যেতে তার মনে হলো কুয়াশার ভিতরে কেউ তাকে দেখতে পাচ্ছে। সে ডাক দিল, কেউ আছ, আমি রাজার বাড়ি যাব, কোন পথে যাব ?
     হলুদ পাখি খবরিয়া ছিল এক শাল গাছের ডালে, বলল, যে পথে যাও, রাজার বাড়ি পৌঁছবে।
    কোন পথে তাড়াতাড়ি পৌঁছব ?
    খবরিয়া পাখি  বলল, যে পথে যাও, একই দূর।
     রাজার বাড়ি উত্তরে না দক্ষিণে, পুবে না পশ্চিমে ?
    উত্তর দিক দিয়ে যাওয়া যায়, পুব দিক দিয়েও যেতে পার, পশ্চিমে রাজার বাড়ি আবার দক্ষিণেও সেই একই বাড়ি, গারো পাহাড় আর  সিমসাং নদীর  রাজা তোমার জন্য  বসে আছে ধামা ভরা ফল-পাকুড় আর গজা,  কদমা নিয়ে।  হলুদ পঙ্খী বলল।
     লোকটা নিশ্চিন্ত হয়। এমনিই শুনেছিল বটে। সে জিজ্ঞেস করল, আর কত সময় লাগবে ?
     হলুদ পঙ্খী বলল, সময় কী তা তো জানি না, তুমি ঠিক পৌঁছে যাবে।
    লোকটি অনেক লম্বা, স্বাস্থ্যবান,গৌরবর্ণ, সে চলল কুয়াশার ভিতরে। চলতে চলতে চলতে, আচমকা দেখল কুয়াশা নেই। বিকেলের আলো যেন মুছে যেতে যেতেও রয়ে গেছে। রোদ নেই। আলোর ভিতরে সূর্যাস্তের লালচে ভাব।
    তখন গারো রাজার সমুখে বসে অতীনের  মনে হচ্ছিল রাজার বাড়ি নয়, এক বিভ্রমবাড়ি এসে পড়েছেন তিনি। তিনি স্পষ্ট ্দেখলেন, কুয়াশার প্রাচীর ভেদ করে এক রাজপুরুষ প্রবেশ করল রাজার বাড়ি। এঁকে তিনি বনের ভিতরে দেখেছিলেন।  তাঁর সমুখে অনেক দূরে হেঁটে চলেছিলেন তিনি। তিনিই রাজা সোমেশ্বর পাঠক। সোমেশ্বর সিংহ। আকাশের এক তারা। 
   কুয়াশার দরজা ভেদ করে লোকটা পৌঁছে গেল। রাজা্র সমুখে অতিথির জন্য একটি আসন। আসনের সামনে পানীয় জল, মিষ্টান্ন। রাজা তাকিয়ে আছেন অতিথির মুখের দিকে। অতিথিও রাজার দিকে চেয়ে আছেন।
   রাজা বিস্মিত গলায় বললেন, তুমি ?
   হ্যাঁ আমি। লোকটি বলল।
   তুমি কি এই প্রাসাদ অধিকার করবে ? রাজা অকম্পিত গলায় জিজ্ঞেস করলেন।
   লোকটা মাথা নিচু করল, বলল, আমি সব ফেরত দিতে এসেছি রাজা।
   তুমি সোমেশ্বর পাঠক !
   হ্যাঁ মশায়, রাজা।
   রাজা জিজ্ঞেস করলেন, কী ফেরত দেবে ?
   যে রাজ্য জয় করেছিলাম, সেই রাজ্য। বলে দীর্ঘদেহী সেই রাজপুরুষ দুহাত বাড়িয়ে দিলেন। 
   রাজা বললেন, আমাকে কোন রাজ্য ফেরত দেবে, রাজ্য তো আমার আছে।
   আছে ! বিস্মিত হলেন রাজা সোমেশ্বর পাঠক।
   আছে, আমার রাজ্য তো আমারই আছে, কিছুই তুমি নিতে পারোনি।
   সোমেশ্বর পাঠকের চোখে জল এসে গেল, বললেন, তাই বলছ রাজা ?
   হ্যাঁ, আমার কিছুই যায়নি রাজা, তুমি কী দেবে ?
   সোমেশ্বর উঠে দাঁড়িয়ে এগিয়ে গেলেন গারো রাজার দিকে। গারো রাজা, সিমসাং নদীর রাজা উঠে এগিয়ে এলেন। আলিঙ্গন করলেন তাঁরা পরস্পরে।  আর তখনই অন্ধকার নেমে এল। সূর্যাস্ত হলো। প্রাসাদ আর রাজা  সব মুছে গেল জগত থেকে। দেখল সব সেই হলুদ পঙ্খী খবরিয়া । সে উড়ে গেল এই কাহিনি নিয়ে। রাজার বাড়ি নেই। দুই রাজা আর নেই। কুয়াশা আর নেই। আমি পাহাড় থেকে ফিরে এলাম। হ্যাঁ, সেই হলুদ পঙ্খী আর আমার সামনেই যেন সব ঘটেছিল। অথবা সমস্তটাই এই পান্ডুলিপিতে লেখা ছিল। পাণ্ডুলিপি থেকেই তো আমি শোনাচ্ছি এই কাহিনি। 
 

স্মরণ






                                                              কবি গীতা চট্টোপাধ্যায়

নীলকণ্ঠ পাখির পালক


নন্দিনী। ... আমার জানালার সামনে ডালিমের ডালে রোজ নীলকণ্ঠ পাখি
এসে বসে। আমি সন্ধে হলেও ধ্রুবতারাকে প্রণাম করে
বলি, ওর ডানার একটি পালক আমার ঘরে এসে যদি  উড়ে 
পড়ে তো জানব আমার রঞ্জন আসবে। ... রক্তকরবী


যদি বলি আমি পালক কুড়োব বলে
কবে যেন সেই যাত্রা করেছি শুরু
তুমি কি সেই কথা বিশ্বাস করবে না
অপরে না হয় তুলেছে তুলুক ভুরু।

গদ্য- গৌরাঙ্গ শ্রীবাল




কুয়াশায় ভেসে যাওয়া ধোঁয়াশার জীবন



গর্ভের ভারে ঝুঁকে পড়েছে হেমন্ত ধানের গাছ। গ্রামীণ শাঁখের ধ্বনি শুনে ঘুম থেকে জেগে ওঠে তারা দিনের প্রথম স্নান সেরে নিচ্ছে শিশিরে। এমনই বাসি কাপড়চোপড় ধোয়া অভ্যাস গ্রামের বউদের। সংসারের সমস্ত কাজে শুদ্ধতার মনোনিবেশ। তখন তাদের লোকলজ্জা ঢেকে দেয়  হেমন্তের ভোরের পাতলা কুয়াশা। হেমন্তের মাঠ থেকে মরে যেতে যেতে পৌষের কাছে এসে গাঢ় হয়, এবং মাঘের শেষে ফিকে হতে হতে ফাল্গুনের বনে বাসন্তী রঙের ওড়নার মতো উড়তে উড়তে হারিয়ে যায় চৈত্রের বাতাসে।
     কথায় কথায় যে হিমের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে তার জন্ম আশ্বিন-কার্তিকে। শরতের শেষ, হেমন্তের শুরু। হিম অর্থে শীতকাল, তুষার, শিশির। শীতকাল কুয়াশার দিন। শিশিরের ফোঁটা বাতাসে ভেঙে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র হয়ে আরও সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম কণায় জন্ম নেয় কুয়াশা। কুয়াশা কখনও কখনও এমন গাঢ় ঘন হয় যে সামনের সমস্তকিছুই থাকে অদৃশ্য। চেনা যায় না কাছের, অতি কাছের মানুষটিকে। মনের ঘাতপ্রতিঘাত, ভালোমন্দের দ্বন্দ্বের সঙ্গে কুয়াশার খুব ভাব। ব্যক্তিত্বে আঘাত লাগা ব্যক্তির কাছে তার পরিচিত মানুষের হৃদয় কুয়াশার মতো অস্পষ্ট। এই অস্পষ্টতার ভিতর দিয়ে ভূতের মতো লাল, নীল, হলুদ আলো জ্বেলে এগিয়ে আসে ভোর অথবা রাতের গাড়ি। ছিঁচকে চোরের কাছে কুয়াশা একটা প্রাকৃতিক আড়াল। যখন তার বামাল নিয়ে দ্রুত লুকিয়ে যাওয়ার পক্ষে সহায়ক।
   কুয়াশার সঙ্গে কৃষিজীবী মানুষের সম্পর্ক গভীর। হেমন্ত ধান, সবুজ শাকসবজি, ফুলের সৌন্দর্যের সময়। হালকা কুয়াশা যেমন ফসলের শ্রীবৃদ্ধির পক্ষে ভালো, তেমনই ভারী কুয়াশা ফসলের অনেক ক্ষতির জন্য দায়ী। জীবনযাপনের মধ্যেও হালকা ও ভারি কুয়াশার প্রচ্ছন্ন প্রভাব বর্তমান। হালকা কুয়াশা জনজীবনে আনে একটা আমেজ, ভারী কুয়াশার মধ্যে ঘুরে বেড়ায় অসুখবিসুখের জীবাণু। তবুও খুব ভোরে উঠে কুয়াশার চাদর গায় জড়িয়ে কৃষিকাজের জন্য হাঁটতে হাঁটতে মাঠে যায় গ্রামের নারীপুরুষ। বেঁচে থাকার একটা অদম্য মায়া, টান। জীবনকে ভালোবেসে যে বেঁচে আছে তা নয়। এই ঘর, এই সংসার, ফসলের ঘ্রাণ তাদের বাঁচার গল্প বলে অবিরাম। এরকম করুণার গল্প শুনে আমার মতো একটি কিশোরের কৃষক বাবা, কাকা, দাদু ভোরের কুয়াশায় কখন যে বিছানা ছেড়ে উঠে চলে যেত সে বুঝত না। যখন ঘুম ভাঙত, দেখে দাদু কিংবা কাকার মাথায় একআঁটি দীর্ঘ ধানের গাছ। সে দীর্ঘতা ছাড়িয়ে যেত তার সমস্ত উচ্চতা। ঠিক সেই সময় হেমন্তলক্ষ্মীর ঢাকা নয়নের মতো কপালের নীচে ঘোমটা টেনে উঠোনের নরম রৌদ্রে দাঁড়িয়ে শাঁখ বাজাচ্ছে কখনও মা, কখনও ঠাকুমা।
     একসময় দেখা যায় কুয়াশার ভিতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে গ্রামান্তের সিউলি। যারা আরও কোনও দূরান্ত থেকে এসে বেঁধেছে খেজুর পাতার অস্থায়ী ঘর। সেটা ঠিক ঘর নয়, কুঁড়ে। তাদের কাঁধে বাঁকা বাঁশের বাঁক। বাঁকের দু-প্রান্তে দড়ি দিয়ে ঝোলানো কয়েকটি মাটির হাঁড়ি। চলাক চলাক করে খেজুরের কাঁচা রস। বুকের সমস্ত রস নিংড়ে দিতে দিতে মেয়েদের মতো গ্রামের বনজঙ্গলের খেজুর গাছগুলি উজাড় হতে বসেছে প্রায়। যে দু-একটি আছে তাদের লিকলিকে ডাঁটার পাতা থেকে ঝরে পড়ে ফোঁটা ফোঁটা শিশির, মনে হয় তারা কাঁদছে বুকের ব্যথায়। কারণ খেজুর গাছের রস আসে বুক থেকে। শুধু খেজুর গাছ নয়, যেকোনো রসের উৎস বুক, হৃদয়। সিউলির বাঁকে ঝোলা হাঁড়ির মতো সময়ের কাঁধে ঝুলে ঝুলে চলছে জন্ম ও মৃত্যু। কোনোদিকের ভার বেশি হলে হারিয়ে যায় দেহের ভারসাম্য, চলার ছন্দ, জীবনের সত্য। জন্ম যেমন সত্য, মৃত্যুও তেমন সত্য। এই সত্য কুয়াশার মতো এতখানি অস্পষ্ট না হলেও ফেলে দেয় একটা ঘোরের মধ্যে।
     খেজুরের রস আগুনে জ্বলেপুড়ে মরতে মরতে যখন গাঢ়ত্বলাভ করে তখন ঘনিয়ে আসে পৌষমাসের সংক্রান্তির মহালগন। একদিকে পাপমুক্তির জন্য গঙ্গায় পুণ্যস্নান, অন্যদিকে পুলিপিঠের সুমিষ্ট গন্ধ। গৃহস্থের দরজার কাছে হাত পেতে দাঁড়িয়ে থাকে ঈশ্বরের দলিত সন্তান। যারা সারাজীবন কুয়াশায় ঘুরে ঘুরে খুঁজে পেয়েছে এই সত্য, সাগরের জলে হাসতে হাসতে ভেসে যায় সূর্যপূজার ফল এই ফল কোথা যায়? পৃথিবীর সমস্ত জলের সঙ্গে সমস্ত জলের একটা গভীর সুসম্পর্ক। যেমন চোখের জলের সঙ্গে সাগরের জল। উভয়ের স্বাদ নোনা। সব জলই রৌদ্রের স্পর্শে বাষ্পীভূত হয়ে শিশির, শিশির থেকে কুয়াশা। যে কুয়াশার ভিতর দিয়ে সাঁতার কাটতে কাটতে আসে সরস্বতী পূজার হাঁস।
     মাঘমাসের পঞ্চমীতিথি। কথায় বলে মাঘের শীত নাকি বাঘের মতো। কিন্তু বাতাস ঘুরে গেছে বসন্তের পথে। ওপথে দখিনের হাওয়া ঢুকে আরও ঘন করে দিয়েছে কুয়াশার জাল। সেই জাল কেটে পুকুরের জল থেকে উঠে এসে শতরূপার পায়ের কাছে ডানা গুটিয়ে বসে খোঁড়া হাঁস। ভ্যানরিক্সায় চেপে তার আগে পৌঁছে গেছে বাঙ্ময়ী। হাঁস ও তার মালকিন চুপচাপ দেখে কিশোরবেলার কীর্তি। অঞ্জলি দিতে ঠকুরমশায়ের পুষ্পপাত্র থেকে দুটি ফুল নিয়ে যে কিশোর একটি ফুল রেখেছিল হাতে, আর একটি ফুল গুঁজে দিয়েছিল কিশোরীর কিলিপআঁটা মাথার চুলে। লোকে বলে এটা নাকি বাঙালির প্রেমের দিন। অঞ্জলির মন্ত্রের বদলে হয়ত সে বলেছে মোরে আরও আরও দাও প্রেম। তাই বোধ হয় পড়াশুনাটা চণ্ডীপাঠ পর্যন্ত না গিয়ে আটকে আছে জুতো সেলাইয়ে। তবু তো তার হাতে একটা কাজ আছে, যা জীবনের আর্থিক ভিত। আজকের নাম্বারসর্বস্ব জীবন সুদূর-অদূর ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে কী দেখছে! তাদের চোখও কি অশ্রুসজল সামাজিক কিংবা ভক্তিমূলক যাত্রাপালা শুনতে যাওয়া পাড়াগাঁর সাধারণ মানুষের আবেগী চোখের মতো ঝাপসা হয়ে ওঠেনি ব্যর্থতায়! ঝাপসা তো কুয়াশার বৈশিষ্ট্য।
     সারাজীবনের পরিশ্রম দিয়ে সেলাই করা জুতা পায়ে হাঁটতে হাঁটতে দেখা যায় আঁতুড়ঘরের অস্পষ্ট অন্ধকারে সান্তান কোলে নিয়ে শুয়ে থাকা প্রসূতির মতো আজও কুয়াশার মাঠে শুয়ে আছে প্রসবিনী ধান গাছ। এ শুয়ে থাকা আসলে তাদের প্রতিবাদহীন মৃত্যু। মানুষের পেটে দু-মুঠো ভাতের জন্য তারা তাদের ধান্য-সন্তানগুলিকে খামারে রেখে কৃষকের নিঠুর দা-এর আঁচড়ে মারা গেছে মাঠেই। কিছুদিন পরে হয়ত আর মাঠে মাঠে দেখা যাবে না এ দৃশ্য। কারণটা একপ্রকার মাৎস্যন্যায়। এখানে বড়ো মাছ, ছোটো মাছকে খায় না। সব মাছই দল বেঁধে খেতে আসছে কৃষিজীবী মানুষের চাষের একফসলি, দোফসলি চাষযোগ্য জমি। এর পেছনে কারা আছে তা আর কুজ্ঝটিকার মতো অস্পষ্ট নয়। কুয়াশার আর এক নাম কুজ্ঝটিকা। এমনই এক মাঘমাসের রাতে কুজ্ঝটিকার মধ্যে পড়ে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘কপালকুণ্ডলা’ উপন্যাসের গঙ্গাসাগর থেকে ফেরা এক যাত্রীবাহী নৌকার মাঝিরা দিক ঠিক করতে ভুল করে চলে এসেছিল ‘রসুলপুরের নদী’র কাছে। সেই নৌকার এক বৃদ্ধযাত্রী বাড়িতে চুরির ঘটনায় উদ্বিগ্ন হয়ে বলেছিলেন,-‘ছেলেপিলে সম্বৎসর কাবে কি’? সেই ভাবনা আজকের বিপন্ন চাষিদেরও। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষগুলো মেছো দালালের পাল্লায় পড়ে চাষের জমি হারিয়ে, হাতের কাজ হারিয়ে, বাতে, পক্ষাঘাতে পঙ্গু হয়ে ঘরে বসে দেখছে ঘনঘোর কুয়াশা। গ্রাস করছে হতাশা।
     কুয়াশাকে আরও জটিল করে তোলে ধোঁয়া। ধোঁয়া ও কুয়াশা একসঙ্গে মিশে তৈরি করে ধোঁয়াশা। ধোঁয়াশা কুয়াশার থেকে ঘন না হলেও একটা জটিল আবর্তের মতো ভেসে বেড়ায় বাতাসে। এ যেন জীবনের দুঃখ, কষ্ট, যান্ত্রণা। প্রতিটি জীবনে কোথাও না কোথাও লুকিয়ে থাকে একটা যন্ত্রণা। তাঁর সঙ্গে মাঝে মাঝে এসে জুড়ে যায় দুঃখ-কষ্ট-ব্যথা-গ্লানি। তখন ভিতরের যন্ত্রণাটা অতিরিক্ত কুয়াশা কিংবা ধোঁয়াশার জটিলতা তৈরি করে নষ্ট করে দেয় হৃদয়ের ফসলোন্মুখ সৃষ্টীশীল সমস্ত সম্ভাবনা। জীবন্মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মানুষ দেখে চারপাশে ধোঁয়াশার অন্ধকার। এই অন্ধকারের ভিতর দিয়ে হাহাকারের মতো ঝরে পড়ে সমস্ত পাতা। ছড়িয়ে পড়ে শুকনো পাতা পোড়ানোর ঝাঁঝালো গন্ধ ভরা আরও একপ্রস্ত ধোঁয়া।
     রোদ উঠলে, বাতাস দিলে একসময় সরে যায় প্রকৃতির সমস্ত কুয়াশা, ধোঁয়াশা। কিন্তু হৃদয়ের ভিতরে যে ব্যর্থতা, গ্লানি, হতাশার কুয়াশা তা একটি সূর্য তো দূরের কথা, হাজার হাজার সূর্যও দূর করতে পারে না, যদি না বসন্তের মতো কেউ এসে বাড়িয়ে দেয় নতুন পাতার হাত। চুরাশি লক্ষ যোনি অতিক্রম করেও বাতাসের দৃষ্টিপথে ভাসমান সেই একই কুয়াশা।

হিন্দুরাষ্ট্র, মৌলবাদ এবং কিছু অসঙ্গতি -- হিন্দোল ভট্টাচার্য







হয় এ পক্ষ নিতে হবে নয় অন্য পক্ষ। ব্যক্তিগত ভাবে আমি এই বাইনারির বিপক্ষে ছিলাম। কিন্তু ভারতবর্ষ এখন এমন একটা জায়গায় এসেছে, যে পক্ষ আমাকে নিতেই হবে। আপনাকেও। কারণ যা কয়েকদিন আগেও আমাদের মতো কয়েকজনের আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, তা এখন আমার আপনার ঘরের দরজায় শুধু টোকা মারছে তা-ই নয়, ঘর থেকে টেনে বের পর্যন্ত করে দিতে পারে। হিন্দুরাষ্ট্রের দালালরা তাদের দাঁত নখ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। আপনারা সবকিছুই দেখতে পাচ্ছেন আজ ভিডিওতে। দেখছেন কীভাবে জামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারত নামের অধুনা হিন্দুরাষ্টের পুলিশ ভারত নামের গণতান্ত্রিক দেশের নাগরিক ছাত্র ছাত্রীদের উপর গুলি আর টিয়ার গ্যাস বর্ষণ করছে। কীভাবে তারা টেনে হিঁচড়ে রাস্তায় নামিয়ে মারছে। দেখতে পাচ্ছেন সারা দেশে আগুন জ্বলছে। উত্তরপূর্ব ভারত বিচ্ছিন্ন। আমাদের এই বাংলাতেও দিকে দিকে আগুন জ্বলছে। মানুষ অস্থির হয়ে অসহিষ্ণু হয়ে কী করবে ভেবে পাচ্ছে না যেমন, তেমন উস্কানি দিয়েও চলেছে হিন্দুরাষ্ট্রের দালালরা। এই সব দালালরা কী করছে? গোপনে বাসে আগুন লাগিয়ে অন্যদের নামে বলে দিচ্ছে। বাড়ি বাড়ি আগুন লাগাচ্ছে। মূল লক্ষ্য তাদের সাম্প্রদায়িক হিংসা ছড়ানো। কারণ সাম্প্রদায়িক হিংসা ছড়ালে তাদের উপকার। হিন্দুরাষ্ট্রের ক্যাম্পেনিং তারা আরও ভালোভাবে করতে পারে।
এবার পক্ষ নিতে হবে বন্ধু। হয় হিন্দুরাষ্ট্র নয় ভারতের গণতন্ত্র। মানছি এ দেশের গণতন্ত্র আছে কিনা, তা অনেকের কাছেই প্রশ্নের। কিন্তু একটা কথা তো মানতেই হবে, হিন্দুরাষ্ট্রের বিরোধী সমস্ত কিছুকেই আমাকে সমর্থন করা দরকার। হিন্দুরাষ্ট্রই আমাদের বাইনারি চোখে দেখতে বাধ্য করছে। তা না হলে তো আমরা বহুস্তর বহুস্বরকেই আমাদের আদর্শ মেনে নিয়ে ছিলাম। কিন্তু এই বহুস্বরকে মেনে আজ হিন্দুরাষ্ট্রের স্বরকেও উচ্চগ্রামে উঠতে দিলে আর সেই স্বর আমাদের নাগালের মধ্যে থাকবে না। যেমন, যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা উস্কে দেওয়ার চেষ্টা করছে এই হিন্দুরাষ্ট্রের দালালরা, তা একবার যদি লেগে যায়, তবে আর তা কারো পক্ষেই সম্ভব নয় সামাল দেওয়া। স্বয়ং গাঁধিও অনেক কষ্টে সামান্য তা সম্ভব করতে পেরেছিলেন। কিন্তু সেই পারাটাও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।

এই যে আমরা চোখের সামনে মৌলবাদকে ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে যেতে দেখলাম, তা তো একদিনে হয়নি। মৌলবাদ একটা অসুখ, যা বহুদিন ধরে আমাদের রক্তের মধ্যে, আমাদের স্নায়ুর মধ্যে বাসা বেঁধে আছে। তার প্রকাশ নানারকম ভাবে হয়ে চলেছে। এই তো কয়েকদিন আগে, একজন অধ্যাপক কবি প্রয়াত সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের চরিত্র তুলে জঘন্য ভাষায় পাবলিক পোস্ট দিলেন। সেই পোস্টে বেশিরভাগ মহিলা সাহিত্যিক এবং কবিদের সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের শয্যাসঙ্গিনী করে তুললেন। এভাবে অসহিষ্ণুভাবে অনৈতিক ভাবে অপমান করার অধিকার তাকে কে দিল তা কেউ জানে না। কিন্তু এই নীতিবোধ, এই শ্রদ্ধাবোধ এবং এই সৌজন্য আমাদের মধ্যে থেকে মুছে যাচ্ছে যে এভাবে সমস্ত মানুষকে অপমান করা কোনও সাহিত্যিকের বা কবির বা অধ্যাপকের কাজ হতে পারে না। অথচ যিনি করলেন তিনিই ধর্ষন বিষয়ে পাতার পর পাতা লেখেন। তিনিই ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে কলম ধরেন। আবার তিনিই যে কোনও একজন অগ্রজ এবং ইহজগতে না থাকা সাহিত্যিকের বিরুদ্ধে অশ্লীলভাবে জঘন্য ভাষায় আক্রমণ করেন ও তাঁর সূত্র ধরে আরও নীচ মন্তব্য করেন মহিলাদের। এটিও কি ধর্ষণ নয়? মৌলবাদ নয়? বা, ধরুন, এই যে আমরা বলি, ইনি কবি এবং ইনি অকবি, এর মধ্যেও কি নিজের মৌলবাদী সুপিরিয়রিটি ব্যক্ত করার প্রবল বাসনা নেই? বা, ধরুন, আমি যদি এখন সাংস্কৃতিক গুণ্ডা হয়ে যাই, তাহলে কি আমিও ব্যক্তি মানুষ কার সঙ্গে সময় কাটাবে, কার সঙ্গে ছবি তুলবে, কার সঙ্গে প্রেম করবে, কার সঙ্গে শোবে, সে বিষয়ে মতামত জাহির করব না? বলব না, এটা কোর না, এটা কর! এটাও যে মৌলবাদ।

এই কয়েকদিন আগে ফেসবুকে ঘটে চলা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে জঘন্য ভাবে আক্রমণ করার বিরুদ্ধে হয়ে গেল সুনীল সরণি। খুব ভালো অনুষ্ঠান। কিন্তু এই অনুষ্ঠান কি পারল আমাদের মধ্যে শ্রদ্ধাবোধ ফিরিয়ে দিতে? শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেই নিশানাথের কথা মনে পড়ে যিনি বলেছিলেন যে জাতি নিজেদের প্রতি শ্রদ্ধা হারিয়েছে, তারা আর কাকে শ্রদ্ধা করবে? কিন্তু এমনটা হচ্ছে কেন? কেন একজন কবি -অধ্যাপক অশিক্ষিতের মতো ভাষায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে অপমান করেন? কেন এই বাংলায় কোনও কবির সম্পর্কে আর্থিক ভাবে প্রতারণার দায় চাপিয়ে তাঁকে আক্রমণ করা হয়? এমন একজন কবি, যিনি কবি হিসেবে কয়েক আলোকবর্ষ উচ্চে। এখানেও কি ন্যুনতম শ্রদ্ধাবোধ রইল আমাদের? যেমন কবীর সুমনকে কতকিছুই না সহ্য করতে হয়েছে। তিনি কেন পাঁচটি বিবাহ করেছেন, কেন তিনি মুসলমান হয়েছেন, এগুলিই যেন প্রধান আলোচ্য বিষয়। যেন এগুলি বলবে কেন তিনি কালজয়ী শিল্পী। সুমনের বাংলা গান, বাংলা ভাষা এবং বাংলা ভাবনার জগতে যে আবেদন, সেই জায়গা কি কেউ নিতে পারবেন আগামী একশ বছর?

কিন্তু আমরা যখন আলোচনা করি, তখন ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আলোচনা করি অনেক বেশি। ব্যক্তিগত বিষয়কে সরিয়ে তাঁর সৃষ্টি নিয়ে আলোচনা আমরা করি না। আমাদের সমালোচনায় কাজ করে তীব্র বিষাক্ত মৌলবাদ। হয়তো আমরা সেই মৌলবাদকে মৌলবাদ হিসেবে বুঝতে পারি না। কিন্তু এই অসহিষ্ণুতা, এই ভায়োলেন্স এবং এই নির্মম বাইনারি প্রেফারেন্সগুলি শেষ পর্যন্ত নিজস্ব অনুশাসনে পরিণত হয়ে যায়, যে অনুশাসনকে আমরা চাপিয়ে দিতে চাই প্রত্যেকের উপরেই। আমাদের মধ্যে থাকা এই মৌলবাদী প্রবণতাকেই কাজে লাগিয়ে আজ হিন্দুরাষ্ট্র গড়ে তোলার দিকে এগিয়ে চলেছে ভারতের শাসক।

তাহলে আবার প্রসঙ্গে আসি। আজ থেকে বহুবছর আগে থেকেই এই মৌলবাদী ট্রেন্ড আমাদের জনজীবনকে গ্রাস করেছে। মুসলমানদের প্রতি তথাকথিত বর্ণহিন্দুদের বিদ্বেষ গোপনে তো ছিলই। কিন্তু সেই বিদ্বেষকে এখন একটা খোলা হাওয়ায় সামাজিক প্রবণতা গড়ে তুলে তাকে শাসনের ও ক্ষমতা কাঠামোর বিশেষ একটা অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা ভারতীয় শাসকদের বহুদিনের অস্ত্র।

বিজেপি বা ভারতীয় রাষ্ট্র প্রধানমন্ত্রী মোদী ও তার সহায়ক অমিত শাহ-এর হাত ধরে এমন-ই এক রাষ্ট্র গড়ে তোলার জন্য এখন একটার পর একটা পদক্ষেপ গ্রহণ করে চলেছে, যেগুলি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ও মধ্যবর্তী সময়ে যে জার্মানিতে যে ফ্যাসিবাদী আগ্রাসন তৈরি হয়েছিল, তার ব্লু প্রিন্ট। বিপুল ভোটে জিতে সোশ্যাল ডেমোক্রেটদের থেকে নীরবতার সম্মতি ও বিরোধ না পেয়ে কার্যত বিরোধীশূন্য অবস্থায় আর্যাবর্তের দর্শন ঘাড়ে চাপিয়ে উন্মত্ত জার্মান নাগরিকদের বিপুল সমর্থন পেয়ে গড়ে উঠেছিল নাগরিক সংশোধনী আইন, যার জেরে ইহুদীদের স্থান হয়েছিল কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে। তার পর সেই সব কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প যে বিরোধী সমস্ত কণ্ঠের জীবনের শেষ আশ্রয় হয়ে উঠবে, এ বিষয়েও ইতিহাস এখনও মুখ নীচু করে থাকে। যখন বারবার এখানে উচ্চারিত হয়েছিল বিজেপির উত্থান, রাজনীতি এবং কার্যধারা, তখন থেকেই স্পষ্ট হয়েছিল ফ্যাসিবাদী উত্থান।

আর দেখুন এই শাসকদের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে কারা আনল? আমাদের দেশের নাগরিকরাই তো আনল। এত ভোট তো কারচুপি করে পাওয়া যায় না। প্রসঙ্গটা ১৩০ কোটি মানুষের। ফ্যাসিবাদ সম্পর্কে জানেন কজন? এই দেশের কজন দেশের এই স্বৈরাচারী শাসকদের সম্পর্কে জ্ঞাত? এই শাসকদের ইতিহাস সম্পর্কে জ্ঞাত? যেমন আমরা না চিনি আমাদের মনের ভিতরে থাকা অন্ধকারকে, তেমন আমরা ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমানকে যুক্ত করে দেখতে পাই না। কারণ আমাদের চোখে ঠুলি পরানো থাকে। ইতিহাসের কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে ভারতের জনগণ যদি চলত, তাহলে ফ্যাসিস্টদের উঠতেই দিত না।

কিন্তু এখন, আপনারা নিশ্চয় মানবেন, মৌলবাদ যেমন তার সমস্ত দাঁত মুখ অসহিষ্ণুতা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে আমাদের জীবনে, তেমনটা আগে কখনও হয়নি। কী তাদের লক্ষ্য? হিন্দুরাষ্ট্র। যেমন হাসপাতালে অক্সিজেন সিলিন্ডার যাক না যাক, আমাদের বেকারত্ব কমুক না কমুক, জীবনদায়ী ওষুধের দাম কমুক না কমুক, মানুষ চাকরি পাক না পাক, আগুন বাজারে তরিতরকারির দাম কমুক না কমুক, মন্দির হবেই অযোধ্যায়। এই কিছুক্ষণ আগে খবর পড়লাম মোদীজি বলেছেন প্রতিবাদ যারা করছেন তাদের পোশাক দেখেই বোঝা যাচ্ছে কারা এরা।, অর্থাৎ আবার সেই সাম্প্রদায়িক উস্কানি। একজন প্রধানমন্ত্রীও সেই উস্কানি দিলেন। এর ফলে দেশে যদি আরও আগুন জ্বলে ওঠে, তাহলে বলার কিছু থাকবে না।

যদি বলি হিন্দুরাষ্ট্র বনাম ভারতীয় গণতন্ত্রের নাগরিকদের মধ্যে লড়াই চলছে তাহলে মনে হয় আপত্তি করবেন না? এখন এই হিন্দুরাষ্ট্রের সেবকরা এতটাই নির্লজ্জ , অহংকারী এবং ফ্যাসিস্ট, যে আগে যদিও বা একটু আড়ালে মৌলবাদী পদক্ষেপ নিত এরা, এখন সে সব নেয় প্রকাশ্যে। আর নেয় যে, তার জন্য তার জন্য তাদের মধ্যে বিন্দুমাত্র লজ্জাও থাকে না, সেগুলিকে আড়াল করতেও চায় না। সর্বসমক্ষে জেনোসাইড চালাতে আপত্তি নেই, দাঙ্গা চালাতে আপত্তি নেই, গোমূত্র পানের বিজ্ঞাপন করতে আপত্তি নেই, হুমকি দিতেও আপত্তি নেই। মানে হল এই যে, মৌলবাদী প্রবণতা যা যা ছিল, সেগুলি হয়ে গেছে এদের কাছে স্বাভাবিক এবং গর্বের বিষয়। আর এই সরকার সেই গর্বের বিষয় মৌলবাদকে করে দিচ্ছে সরকারি ভাবে সমর্থিত।

এ দেশ সরকারি ভাবে হিন্দুরাষ্ট্র হওয়ার দিকে আর তাকে যদি আটকাতে হয়, ভারতীয় গণতন্ত্রের সমর্থনকারী যারা তাদের ঐক্যবদ্ধ হতেই হবে। কিন্তু শুধু ঐক্যবদ্ধ হলে যুদ্ধ হয় না। কারণ যুদ্ধটা হিন্দুরাষ্টের বিরুদ্ধে। যুদ্ধের জন্য দরকার পরিষ্কার একটি মতাদর্শ। সেই মতাদর্শকে অবশ্যই বামপন্থী হতে হবে বলে আমি মনে করি। আর এই যুদ্ধ অবশ্যই নিজেদের ক্ষতি করে সম্ভব না। আজ যদি আমি ভাবি আমার পাশের বাড়ির ছেলেটি শত্রু, আগুন জ্বালাও তার দোকানে, যদি ভাবি স্টেশনের স্টেশোনমাস্টার ভারতীয় রাষ্ট্রধর্মের প্রতিনিধি, আগুন জ্বালাও, তাহলে তা আস্তে আস্তে হিন্দুরাষ্ট্রের শাসকদের হাত-ই শক্ত করবে।

নিশ্চিত ভাবেই ভারতে আজ যা চলছে তা জরুরি অবস্থার চেয়েও ভয়ংকর। কিন্তু এই ভয়ংকর অবস্থার মোকাবিলা করার জন্য আমাদের নিজেদের মধ্যে থাকা মৌলবাদী, অশ্রদ্ধার ছায়াগুলিকে সরানো দরকার। তা না হলে আমরা কীভাবে হিন্দুরাষ্ট্রের শাসকদের বিরুদ্ধে লড়াই করব? আমরা যদি মুসলমানদের কাটা, লেড়ে বলে গালি দিই, যদি মনে করি, ওরা শয়তান, তাহলে আমরা কীকরে হিন্দুরাষ্টের বিরুদ্ধে লড়ব?

গণতন্ত্র আমাকে দিচ্ছে আমার বাক-স্বাধীনতা, যা হরণ করে নেবে হিন্দুরাষ্ট্র। গণতন্ত্র দিচ্ছে পোশাক, সংস্কৃতির স্বাধীনতা, যা পরবর্তীকালে চালিত হবে হিন্দুরাষ্ট্র দ্বারা। এই যে লিখছি, তা লিখতে পারছি এখনো, আগামী কাল লিখতে পারব কিনা জানি না, যদি ভারত হিন্দুরাষ্ট্র হয়েই যায়। নেটফ্লিক্সে লায়লা সিরিজটা দেখে নেবেন। অথবা দেখতে পারেন গুল সিরিজটাও। সিরিজ বলে নাক সিঁটকোবেন না। এগুলিও রাজনৈতিক।  যেমন অরওয়েল রাজনৈতিক।

মৌলবাদের বিরোধিতা করতে গেলে উল্টোদিকের মতামতগুলিকে গ্রহণ করাও সমান ভাবে জরুরি। আমি যদি না সহিষ্ণু হতে পারলাম,যদি না আমি পারলাম আমার ভিতর থেকে ফ্যাসিস্ট প্রবণতাগুলিকে দূরে সরিয়ে দিতে, তাহলে আর কীভাবেই বা হিন্দুরাষ্ট্রের বিরোধিতা করব?

ভারতবর্ষ এক ভয়ংকর অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। আমরাও যাচ্ছি। আমাদের ব্যক্তিসত্তাও যাচ্ছে। ফ্যাসিবাদ কিন্তু ব্যক্তিমানুষকেও নষ্ট নোংরা শাসক এবং হিংস্র করে দেয়।

হিন্দুরাষ্ট্র যেন আমাদের এভাবে অধিকার না করতে পারে। আত্মশক্তির বিরোধটা যেন চালু থাকে আমাদের।

কিন্তু পক্ষ এবার নিতেই হবে। হিন্দুরাষ্ট্র না কখনই। পৃথিবীতে কোনও ফ্যাসিস্ট শক্তিকে ভোট দিয়ে পরাজিত করা যায়নি। তার জন্য যুদ্ধ হয়েছেই।

এটা মনে রাখাটাও জরুরি।

'জয় কাবেরীর বই'-- এক আশ্চর্য কাব্যসংসার







'রান্না আর গান একসঙ্গে বয়ে যায়
একদিকে তেল ঝাল মশলা
আর একদিকে সুর তাল লয়।'

কার লেখা এ কবিতা? যদি নাম না দেখি? যদি ভাবি এই কবিতা যার লেখা তিনি এমন একজন কবি, যিনি সংসারের ছোট ছোট বস্তুর মধ্যে, ঘটনার মধ্যে দিয়েই দেখতে পাচ্ছেন বৃহত্তর একটি ঘটনাকে, তাহলে মনে হয় মিথ্যে বলা হবে না। কবিতার একটি সহজ লীলাখেলা আছে। তা যেমন দৈব, যেমন অপ্রত্যাশিত, তেমন-ই তা হাতের কাছেই থাকে। আমাদের পাশাপাশি ঘোরে। আমাদের পাশের চেয়ারে বসে বসে দেখে কীভাবে আমরা হন্যে হয়ে তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। কিন্তু যে পাওয়ার, সে পেয়ে যায়।
কবি কাবেরী গোস্বামীর অন্য যে পরিচয়, তা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। বরং, ভাবা যাক, জেন কবিতা সম্পর্কে কিছু না জানলেও কীভাবে জেন একজন কবির অন্তরাত্মায় প্রবেশ করে যায়। তালপাতা থেকে প্রকাশিত জয় কাবেরীর বই- কাব্যগ্রন্থে এমন কিছু আশ্চর্য কবিতার হদিস আছে, যেগুলি সম্ভবত 'সং অফ ইনোসেন্স' বললেই ভালো হয়। মনে পড়ে যায় উইলিয়ম ব্লেকের কথা অবশ্যই।
সব কবিতা যে সমান মানের তা বলা কখনওই উচিত হবে না। কিন্তু কোনও কোনও কবিতা, কাব্যের শীর্ষদেশ এমন ছুঁয়ে আছে, যেখানে যাওয়া খুব সহজ ব্যাপার নয়। এপিফ্যানির জন্য অপেক্ষা করে নয়, বরং মুহূর্তকে কবিতা করে নেওয়ার এক আশ্চর্য ক্ষমতা আছে কবি কাবেরী গোস্বামীর।
' যখন গিটার দেখি আমি গিটার হয়ে যাই/ যখন সেতার দেখি তখন সেতার হই/ গিটার হয়ে জিমি হেনড্রিক্সের হাতে বাজি/ সেতার হয়ে শাহিদ পারভেজের হাতে'। অথবা আরেকটি কাবেরী গোস্বামীর লেখা জেন কবিতার উদাহরণ- ' নিজেকে সবসময় তৈরি করি এখনও/ ভৈরবী রাগের মতন/ যাতে মধুর থাকতে পারি"।
কিন্তু সমস্ত কবিতাকে ছাপিয়ে গেছে তাঁর এমন একটি কবিতা, যা পড়লে কবিতা লেখার মতো ঘোর এসে হানা দেয়।
কবিতাটি দু লাইনের। কিন্তু পড়ার পরে কবিতাটি ক্রমশ একটি মহাকাব্য হয়ে যায়।

গাছে জবা ফুটে থাকলেই মনে হয়
মা কালী দাঁড়িয়ে আছেন

মাত্র ২৭টি কবিতা নিয়ে জয় কাবেরীর বইয়ের প্রথম অংশ কাবেরী গোস্বামীর লেখা। এক স্বতন্ত্র স্বর, এক স্বতন্ত্র কাব্যভাষা, এক স্বতন্ত্র দৃষ্টি।

দ্বিতীয় অংশ যাঁর লেখা, তাঁর কবিতা সম্পর্কে নতুন করে বলার কিছু নেই। তিনি,কবি জয় গোস্বামী। কাবেরী গোস্বামীর অংশের নাম দুগগা দুগগা। আর জয় গোস্বামীর অংশের নাম দৈব।
কিন্তু কেন দৈব?
কবিতা তো আসলে লিখিত হয়।  কবিতা তো লেখেন না কেউ। নিজেকে কবিতার জন্য প্রস্তুত করে রাখতে হয়। এটিই কবির সাধনা।
সূর্য পোড়া  ছাই কাব্যগ্রন্থটি কবি জয় গোস্বামীর একটা সন্ধিক্ষণ। এই কাব্যগ্রন্থ থেকেই জয় গোস্বামী বাচ্যার্থের বাইরে কবিতাকে নিয়ে যাওয়ার দুরূহ লিখনপ্রক্রিয়া শুরু করেন তাঁর কবিতায়। যার উদাহরণ আমরা পাই সূর্য পোড়া ছাই, মৌতাত মহেশ্বর, ভালোটি বাসিব, প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থে। কিন্তু এই কাব্যগ্রন্থে যেন একপ্রকার বিবাহ ঘটেছে কবির সহজিয়া মন এবং প্রাজ্ঞ মনের। তিনি যেন বোধির উদ্দেশ্যে সাধনায় বসেছেন সাংসারিক বৃত্তের মধ্যে থেকেই।
কিন্তু ওইযে বাচ্যার্থের থেকে শব্দকে বের করে আনা, তার অন্যথা হয়নি।

প্রথম কবিতার প্রথম কবিতাতেই সেই অনুরণন- দৈব আমার ময়ূর, তার গা ধুয়ে দেয় জল।
আট লাইনের এক একটি কবিতা। তার তিনটি স্ট্যাঞ্জা। প্রথমটি তিন লাইনের, দ্বিতীয়টি তিন লাইনের। এবং তৃতীয়টি সনেটের হিরোইক কাপলেটের মতো দুলাইনের।
তেরজার ফর্মকে তিনি এখানে ভেঙে চুরে ব্যবহার করছেন। কিন্তু সনেটের মতো হিরোইক কাপলেট থাকছে।
ফুলের রঙে দেখি স্বয়ং অপ্রত্যাশিতকে।

একজন কবি আজীবন এই অপ্রত্যাশিতকে দেখার চেষ্টাই করে যান। আর করে উন্মাদ হয়েও যান। তাঁর নিয়তিই হল এই পতঙ্গের মতো আগুনের দিকে ছুটে যাওয়া।

'আমার ঘরে কোন প্রহরী দ্বার খুলে দেয় রাতে? আমরা যেন রবীন্দ্রনাথকে আবার খুঁজে পেলাম। এই কাব্যগ্রন্থের ছত্রে ছত্রে রবীন্দ্রনাথ আছেন, কিন্তু কবি রবীন্দ্রনাথের বিনির্মাণও করেছেন। রবীন্দ্রনাথকে নিজের মতো করে, এই সময়ের মতো করে আবিষ্কার করার এমন অসামান্য কাব্যভাষা আগে পড়িনি।
'দানের কাছেই বসব তবে, কোথাও নেই বাধা
রাত্রি অবসানের তীরে আমার ঘর বাঁধা...

অথবা

কোনখানে কী পা ফেলেছি , পায়ে জড়ায় কাঁটা
কী বিষমধু কী মধুবিষ নিয়ে আমার হাঁটা...

আহা, এই তো কবিতা। এই তো সেই কবিতা যার কাছে এসে দু দণ্ড এসে বসে থাকতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু এখানেও কি জয় কবিতার বাচ্যার্থকে অতিক্রম করে ওঠার কাজটি করলেন না? করলেন। কিন্তু কী নিবিড় ও কী নীরবতায়!

দৈব সম্পর্কে যদি একটা বাক্য বলতে হয় তবে সম্ভবত এই কথাটিই বলব। নিবিড় ও নীরব। অথচ ছত্রে ছত্রে কবিতার অন্তর্ঘাত। অন্তর্ঘাত-ই বলব, কারণ যেমন রবীন্দ্রনাথ খুব সহজ কিছু কথার মধ্যে ঢুকিয়ে দেন অন্তর্ঘাতী সব লাইন, হয়তো বা কিছু চিত্রকল্প, ঠিক তেমন-ই কবি জয় গোস্বামী এখানে কী নিপুণভাবে পাঠককে ভুলিয়ে দেন তিনি আসলে এক মিনিয়েচার পেন্টিং-এর রচয়িতা এই কবিতাগুলিতে।

আসলে ইচ্ছে করে সবকটি কবিতাই তুলে আলোচনা করতে।
কিন্তু সবসময় তা সম্ভব হয়ে ওঠে না।
একটাই কথা বলার এখানে। দৈব, এক স্বতন্ত্র ধারার জয় গোস্বামীর কবিতা।
হয়তো পরবর্তীকালে এই কবিতাগুচ্ছের বড় কোনও অংশ আমরা দেখব না। কারণ পাঠক হিসেবে আমার মনে হল এই কবিতাগুলি এখানেই শুরু ও এখানেই শেষ।

সামগ্রিক ভাবে বলতে গেলে, জয় কাবেরীর বই এক আশ্চর্য সংসার।
'তোমার সাধারণের পাশে আমার সাধারণ'...


গ্রন্থ- জয় কাবেরীর বই
তালপাতা
প্রচ্ছদ-কঁকতোকে লেখা পিকাসোর চিঠি
১৫০ টাকা


হিন্দোল ভট্টাচার্য 

কবিতা- ঈশানী বসাক





ছায়া


জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকাই
ফার্ন গাছটা রোজ মাথা নাড়ে, উঁচু হয়ে দেখতে চায় দূরে ওর মতো কেউ আছে কিনা ... ফার্নের পর থেকে গোটা দুনিয়াটাই রহস্যময়। পৃথিবীর না জানি কত সুখ ওই গাছের ওপারে অথচ মা চিরকাল আমাকে সংসার ছেড়ে যেতে মানা করে গেলো।


সময় থেমে রয়েছে আমাদের এই গুটিকয়েক দরজা জানালায়। মা আমাকে ডাকছেন শুনতে পাচ্ছি। ঘরে সাজানো গোলাপি ফ্রক আর কাজললতায় পাতা গরম কাজল।

মা ডাকছেন , মনা আয় রে , আর লুকোসনা। দৌড়ে যাচ্ছি , কী আশ্চর্য!! হাওয়ার গতি একনিমেষে মায়ের আঁচলের খুঁট ধরে চিবোতে থাকে।

দেখলাম অবিশ্বাস নিয়ে বাবা তাকিয়ে । মা চলে যাবার আগে অবধি বলতেন জানালায় একদম আমার মতো দেখতে একটা মেয়েকে দেখতেন। বাবা, মা চলে যাবার পর রোজ কাজল পেড়ে বিছানাতে রাখতেন। বহুদূর থেকে শুনতাম , মনা আয় তাড়াতাড়ি, সন্ধ্যা হলো, খোলা চুলে ঘুরিস না।

বিষের সাথে সন্ধি করে আগুন




" আর যাব না এমন ভ্রমণে যেখানে বিষের সাথে সন্ধি করে আগুন" এমন পংক্তি লিখেছেন কবি অয়ন চৌধুরী। তাঁর ' যদি দু টুকরো জেরুজালেম ছুঁড়ে দাও ঝুলবারান্দা থেকে' কাব্যগ্রন্থের প্রতিটি কবিতাই আগামী সময়ের কবিতার সাক্ষ্য রাখে। যেমন--
" আমার শূন্যতাকেও একটু আধটু আবির দিও আগত রং - পার্বণে
রঙের খেলায় রাঙিও বসন্ত-শরীর---
এই জেগে থাকা, এই গুমরে ওঠা গান
থেকে যতখানি নীল স্রোতে উঠে আসো তুমি,
তোমার স্পর্শ। আগুন। পুড়তে পুড়তে আরও গান হয়ে ওঠে
রং।  রঙের উৎসারে তোমার আমার এইটুকু অন্তরঙ্গ ভালো থাকা

শুধু শূন্যতা জেনেছে---
সকলের কাছে কৌশলে তা গোপন করে গেছি।" ( রং - পার্বণ)

নরকে এক ঋতুর যে বিষাদময় আগুন একটা সময়ে বাংলা কবিতার ভুবন ও বিশ্ব কবিতার ভুবনকেও অস্থির করে তুলেছিল, হয়তো আমাদের সময় সেই অস্থিরতার মধ্যে দিয়েই এখন যাচ্ছে। সময়ের এই উন্মত্ত অস্থিরতার ভাষা অয়নের কবিতার মধ্যে স্পষ্ট। তিনি লেখার ক্ষেত্রে যেন অবগাহন করেছেন অনন্তকালীন বেদনার স্রোতে। ' একটা মৃদু ভেঙে জন্ম হবে গভীর নিরুদ্দেশ'। এই অসম্ভব একটি সিন্ট্যাক্সের জন্ম হয় তখনই, কবি যখন নিজেকে মশালের আগুনের মতো ছড়িয়ে দিতে পারেন। আবার ' নদী তুমি আঘাত দিয়েছ যত/ তার চেয়েও দামি তোমার বুকের ও দু'ফোঁটা নুন লাগা ক্ষত!"

তাঁর এই কাব্যগ্রন্থটি অনেকটাই মশালের আগুনের মতো। অন্ধকারে যার ফুলকি এদিক ওদিক ছড়িয়ে পড়ছে। 'আমি ক্রমশ আড়াল হয়ে যাচ্ছি/ সেখানে কেউ আমাকে আলাদা করে চিনতে পারে না/ হয়তো বা জুঁইও।" আত্মবিলোপের এক কাব্যিক নিরভিসন্ধির খেলায় মেতেছেন কবি এই কাব্যগ্রন্থে।
সাধারণ প্রেমের কবিতা যেখানে অসাধারণের কাছে পৌঁছে যায়, অয়নের কবিতার এই বইটি তেমন। হয়তো গল্পগুলি সকলের-ই জানা। কিন্তু সে জানাটি, অয়নের কবিতার আবহমান বেদনার স্রোতের মধ্যে মিশে গিয়ে জন্ম দিচ্ছে এক অন্যরকম অন্ধকার। যে অন্ধকারে ' তার চুলের ঘ্রাণের শ্যাম্পু আজ / সাড়ে চারশো বছর সেই পুরুষ আর খুঁজে পেল না..."

এভাবেই তাঁর এই কবিতার বইটিতে অয়ন অনন্তকালের কাছে পৌঁছেছেন। র‍্যাঁবোর বেদনার বোধ এবং রিলকের দর্শন -- এই দুটিই তাঁর কবিতার মধ্যে মিশে গিয়ে জন্ম দিয়েছে এক নতুন কাব্যভাষার। কবি অয়ন চৌধুরীর এই কাব্যগ্রন্থটি পাঠকের কাছে সমাদৃত হবে সন্দেহ নেই। বইটির প্রচ্ছদ শিল্পী তৌসিফ হক।  যথোপযুক্ত প্রচ্ছদ।

কাব্যগ্রন্থ - যদি দু'টুকরো জেরুজালেম ছুঁড়ে দাও ঝুল বারান্দা থেকেই
কবি- অয়ন চৌধুরী
প্রচ্ছদ - তৌসিফ হক
প্রকাশক-স্রোত পাবলিকেশন
মূল্য - ১৫০ টাকা

বেবী সাউ 

সুবর্ণ রায়ের কবিতাসমগ্র






''চা-সিগারেটেই সন্ধ্যা কাটছে যে বেশ'

কবিতাসংগ্রহ হল এমন একধরনের গ্রন্থ, যা একজন কবির জীবনের বৃত্তান্ত বলাই যায়। একজন কবির কাছে এই কবিতাসংগ্রহ ছাড়া আর কিছুই দেওয়ার থাকে না এই পৃথিবীকে। আর কবিতাসংগ্রহ পড়তে গিয়ে, বিশেষ করে ধারাবাহিক ভাবে পড়তে গেলে বোঝা যায় একজন্ কবির কলম কীভাবে এক দিক থেকে অন্য দিকে, এক যাত্রা থেকে অন্য যাত্রায়, এক ভাষ্য থেকে অন্য ভাষ্যে অনায়াস যাতায়াত করে। তাঁর কাব্যভাষা জটিল নয়, আবার তরলও নয়। সরল, অথচ গভীর। যেমন রয়েছে কাব্যের মধ্যে গল্প, তেমন রয়েছে নাট্যও।''আলোককণার চেয়েও গতিসম্পন্ন বস্তু আছে/ আমাদের চাওয়া-পাওয়ার ওধারে গিয়ে আক্ষেপ /হৃৎপিন্ডের লাভ-ডুব-এর অন্তরালে গুমরানো''।

কবিতার বিবিধ প্রাঙ্গনে তিনি অনায়াসে ভ্রমণ করেছেন, করছেনও। আর এই ভ্রমণের মাধ্যমেই রচিত হয়েছে তাঁর কাব্যব্যক্তিত্ব। 'হলুদ বসন্তের তৃষ্ণার রঙ কী নীল'  জাতীয় লাইন তাঁর হাত দিয়ে যখন বেরোয়, তখন বোঝা যায় সুবর্ণ রায় এক সম্ভাবনাময় কবির রাস্তাতেই হেঁটে এসেছেন এতটা দিন।আর সেই রাস্তায় এসে জুটেছে
" আমার সাথেই জ্বালিয়ে দিয়ো
যত আছে পাণ্ডুলিপিগুলো
কী হবে রেখে আর
সেই কবেকার
স্মৃতিভার স্মৃতিভার"

কিংবা এই হাঁটার দীর্ঘ পথে একের পর এক দৃশ্য এসে জোটে আলো এসে জোটে। ' একটা বর্ণ চৈতালি বিকেলের হাওয়ায়/ উড়ে এসে বসে আর একটা বর্ণের/ পাশে-আগে- পিছে/ তৈরি হয় শব্দ' এবং সেই শব্দের সঙ্গে যাপনের ঘর বাঁধেন কবি সুবর্ণ রায়।

কবি সুবর্ণ রায়ের কবিতার ভাষা সহজ সরল। ভাষার ভারে জর্জরিত নয় তাঁর কবিতার লাইন। সহজ কথা সহজ করে বলার মধ্যে যে কারুকাজ তাই তাঁর কবিতাকে দিয়েছে ইতিঙ্গময় এবং ব্যঞ্জনার যুগপৎ মিশ্রণ। সুবর্ণ রায়ের কাব্যগ্রন্থ  "কবিতা সংগ্রহ ৩" -তে আমরা পাই ছয়টি কাব্যগ্রন্থ থেকে নির্বাচন করে তুলে আনা হীরে মুক্তো জহরতগুলি। অসাধারণ প্রচ্ছদ বইটিকে অন্যমাত্রা দিয়েছে।

তাঁর এই কবিতাসংগ্রহ-৩ সমস্ত পাঠকের কাছে সমাদৃত হোক। পাঠক উপকৃত হবেন সন্দেহ নেই।

কবিতা সংগ্রহ ৩
কবি- সুবর্ণ রায়
প্রচ্ছদ- ফয়সল অরফিয়াস
প্রকাশক- দিবারাত্রির কাব্য
মূল্য -১২৫ টাকা

Sunday, December 15, 2019

'নবান্ন', এক নির্বাচিত নৈঃশব্দ






ব্যক্তিত্ব এবং সময়চেতনার মধ্যে যাপন যদি এক নিভৃতির সংলাপ হয়, তবে তা পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলালের কবিতা সম্পর্কে সামান্য হলেও কিছু ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু এই ব্যক্তিত্ব এবংযাপনের গভীরতা এমন-ই, যে এই ইঙ্গিত খুব সামান্যই সেই গভীর  ভাবনাযাপনের এক অংশের প্রতিনিধিত্ব করে। তাঁর অসংখ্য  অগ্রন্থিত কবিতার একটা অংশ বেছে নিয়েছেন গৌতম সেনগুপ্ত এবং গৌতম বসু। নিপুণ সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে তালপাতা থেকে পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলালের নতুন কবিতার বই ' নবান্ন'। সামান্য কিছু ভুল থাকলেও, বাংলা কবিতার পাঠকরা চিরকৃতজ্ঞ থাকবে এই গ্রন্থের জন্য, তার একটা কারণ কবির অনিচ্ছার কারণে দীর্ঘদিনের এই সব কবিতা পাঠক এবং নতুন পাঠকদের ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিল, এবং আরেকটা কারণ, এই কবিতাগুলির মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়েছে কবির ভাবনাচিন্তার অভিযাত্রার একটা অংশ। এমনকী এখন যে কবি একটু অন্যরকম ভাবে হলেও বামপন্থার দিকে, বামপন্থী ভাবনার দিকে ঝুঁকেছেন, তার ইঙ্গিতও এই কাব্যগ্রন্থের মধ্যে দিয়ে আমরা পাচ্ছি। 'কবিপ্রতিষ্ঠার কথা', 'প্রতিযোদ্ধার কথা' , জনক, শিক্ষা, উৎপলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, আমার অন্নচিন্তা, বিপ্লব, বিপ্লবীকে, রক্তাক্ত, নতুন পার্থর কথা-- এমন অসামান্য মণিমুক্তো ছড়ানো আছে এই কাব্যগ্রন্থে। হয়তো একটা কবিতা বা একটা লাইন তুলে দিলে এই কাব্যগ্রন্থের প্রতি অবিচার-ই করা হবে। কিন্তু বাংলা কবিতার সামগ্রিক ইতিহাসের প্রেক্ষিত থেকে বিচার করলে, এই কাব্যগ্রন্থ অবশ্যই এক সম্পদ হিসেবে থেকে যাবে আমাদের কাছে, আগামী সময়ের জন্য। এই কাব্যগ্রন্থ পড়তে পড়তে আরও বেশি মনে হয়, পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলালের কবিতাসমগ্রের খুব প্রয়োজন এখন। বাংলা কবিতার স্বার্থে এই কাজটির জন্য কেউ এগিয়ে আসুন, এটাই প্রার্থনা।

কবিতাগুলির ফন্ট কেন এত ছোট সে বিষয়ে প্রশ্ন থাকেই। প্রচ্ছদ যথাযথ।

গ্রন্থ-নবান্ন
পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলাল
প্রচ্ছদ- অ্যালিস বোনার
তালপাতা
১৬০ টাকা




হিন্দোল ভট্টাচার্য 

কবিতা- সুমন মল্লিক






প্র লা প সি ন্ধু১০


জপের মালার মতো গুনে চলেছি হারানো কথাগুলি ৷ গোনা ঠিক হচ্ছে না ৷ তবে এ-গোনা তো গোনা নয় ঠিক, আসলে আনমনে ভাঙা স্বপ্ন বোনা ৷ ফিরে ফিরে যাওয়া না-ফেরার ফরমানে ৷ এক অনন্ত দূরে চলে গেছে চাঁদের আলোমাখা জোনাকিরা ৷ এখন অচেনা লাগে চেনা পৃথিবী ৷ যে পৃথিবীর অর্ধেকে তৃপ্তি, অর্ধেকে তৃষ্ণা ৷ এই যে রাতের মাঝে কিছু রাতের কূজন, এক স্পর্শ থেকে ছড়িয়ে পড়া অগুণতি স্পর্শের মায়া – এসব আমার ইচ্ছে সমেত অপ্রতিরোধ্য ৷

ভাঙনের মাঝে ভাসছে
ব্যাকুল রাতের ফাগুন ৷
          আমার মজ্জায় মজ্জায়
          তোমার স্পর্শের আগুন ৷

উঠোনে আছড়ে পড়া মেঘ আর বুকে আছড়ে পড়া প্রেম আসলে একই ৷ দুটোই তো ভেজায় দেদার ৷ তবু যে প্রেমে কলঙ্কচিহ্নিত ব্যবধান, তার রাখালকে একদিন ঠিক হারিয়ে যেতে হয় আত্মশূন্যে ৷ সেখানে আগুনকে চুমু খেতে খেতে ফিরিয়ে আনা যায় চিরসখীর গায়ের গন্ধ, সানন্দ-স্তন, অমেয় শৃঙ্গার ৷

আকাশজুড়ে তাঁত চালায় স্মৃতি ৷ ভালই লাগে বেশ ৷ তবু কখনও কখনও এই ভাললাগার মাঝে না-ভাললাগাগুলির উৎস চোখের সামনে দিয়ে চলে যায় মৃদু গতিতে ৷ জীবন তো আসলে শত গতির মাঝে এক গতিহীন পাথর ৷ না ভাঙলে মূর্তি, ভাঙলে মখমল পথ ৷ কী নির্ভুলভাবে যে মেপে ফেলি এখন মন থেকে মনের দূরত্ব ৷ কত সিঁড়ির মরিচীকা কলমের ছোট্ট খোঁচায় গয়েব করে দিই সময়ের গা থেকে ৷ নিজের কদর বাড়ে নিজের কাছে ৷ মাঝরাতে লেখা থামিয়ে অঘোরে ঘুমোতে পারি ৷ ফ্যানের দুরন্ত ব্লেডের সাথে বেঁধে দিতে পারি তথাকথিত দেব ও দেবীদের ৷ এসব পারা তো আসলে গনগনে কয়লার ওপর দিয়ে নগ্ন পায়ে হেঁটে চলা ৷ জ্বলনে বিশোক ফলনের সুখ ৷ সুখ তো নিজের ভেতর লুকোনো নিসর্গেই, আর ‘নিসর্গের রূপ মনশূন্য’ ৷

দেয়ালে টাঙানো ক্যালেন্ডারে হিসেব সাজিয়ে রাখছি বৃষ্টি ও কুয়াশার ৷ বুকে দরদ আছে, দরদে প্রজ্ঞা আছে সুমধুর ৷ মুখ বুজে আছি ৷ মাথা একেবারে উঁচু ৷ বলো সজনী, ফেরৎ নেবে, নাকি ফেরৎ দেবে অনন্ত ঢেউ ভরা মোহন ৷

তাড়ন ! একটা উদ্ধত তাড়নকে পাশে বসিয়েই লীন হতে হয় অভাব ও স্বভাবের স্ফুরণে ৷ ইচ্ছের বুনিয়াদের ওপর দোচালা ঘর বানিয়েছি স্বপ্ন, অশ্রু আর অভিশাপে ৷ অনুতাপে শুধুমাত্র মায়ের স্বপ্নভঙ্গ, রমণীর লুকোনো সন্তাপ আর শহর ছেড়ে যাওয়া সহচারিণীর আশ্চর্য স্মৃতি ৷ আঙুল থেকে বেরোনো প্রতিটা অক্ষর এক একটা খঞ্জর ৷ কাগজে আঘাত গুনে রাখি ৷ আঘাতে গুনে রাখি উপলব্ধির অনুরণন ৷ যে অভ্যাসকে অনুসরণ করি তার গর্ভে আমার বুকের উন্মেষ – তৃপ্তি ও অতৃপ্তির সদাবাহার কারুবিন্যাস ৷

আমাকে প্রশ্ন কোরো না কোন ৷ সব উত্তর আমি লিখে রেখেছি মনে বিঁধে থাকা এক একটা আলপিনের ডগায় ৷ সময় যদি পাও কখনও, এসো ৷ বুকের বা দিকে হাত রেখে বুঝে নিয়ো কোথায় তুমি ৷ অথবা চোখে চোখ রেখে দেখো নজর নত হয় কিনা ৷ মনে রেখো, আগুনেই আমার আনন্দ ৷ পুড়তে পুড়তেই একদিন ঠিক মোড়া পেতে বোসবো সমস্ত আরোপের ফুসমন্তরে ৷





প্র লা প সি ন্ধু১১ 

“জলের ভিতরে শুকনা জমি
আঠারো মোকামে তাই কায়েমি
নিঃশব্দে শব্দের উদগামী
               সে মোকামের খবর জান গা যা রে ৷৷”
                                       -- লালন সাঁই

শেষ হয়েও হয় না শেষ ৷ এ কেমন পিপাসা সজনী ! আঙুলের ফাঁক দিয়ে ঝরে যাওয়া বালুজাহানে মুক্ত করেছি মেদুর শ্রাবণ ৷ তবু কেন শৃঙ্খল... মাথুর-প্রবহ ? অথবা মধুর রহস ?

তোমার হঠাৎ আগমনে
জীবিত হয়ে ওঠে অপরাহ্নের আলো ৷

          আমার উড়ে যাওয়া ঘুম ঘেঁষে বসো,
          খুলে রাখো অভিমান
          আর মুগ্ধতাকে আরও মুগ্ধ করে দিয়ে
                 পঞ্চপ্রদীপ জ্বালো ৷

এমনকী সমস্ত সৃজন এখন পাহাড়ি ঝোরার মতো অবাধ্য ৷ ভাঙচুর করে ৷ তবু সেই ভাঙচুরের মাঝে হাত রেখে একটা নিখুঁত পাথর খুঁজি ৷ কবি থেকে ভাস্কর হবো ? তা নয় ৷ কাগজে কলম চালালে কবি, পাথরে খঞ্জর চালালে ভাস্কর ৷ একই ৷ কোন্ শব্দে আমি তোমায় ফিরে পাই সেকথা শব্দেই গোপন থাকুক ৷

মহালয়ার এই বৃষ্টিভেজা সকাল সব প্রশ্ন ভেঙেচুরে দিল ৷ নৌকোয় বসে মেঘলা আকাশ আর হিমেল বাতাসের মাঝে কত কি যে লিখে ফেললাম  ৷ শুধু তোর্সা জানে ৷ পার ভেঙে গেলে নদী বড় হয়, মন ভেঙে গেলে মানুষ ৷ আমি মন ভাঙা ফকির – নিজের একূল-ওকূল খুঁজে পাই না ৷ ভবঘুরে হই, প্রলাপ বকি, পিপাসার বৃষ্টি এসে ভিজিয়ে দেয় আমার স্বপ্নের চোরাবালি ৷ বুকের পৃষ্ঠা সরিয়ে সরিয়ে পেতে চাই তোমাকেই, অসম্ভব ৷ সম্ভাবনা ভেসে যায়... সম্ভাবনা ভেসে যায়... সম্ভাবনা ভেসে যায়...   





একনজরে

সম্পাদকীয়-র পরিবর্তে

এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না  যে পিতা সন্তানের লাশ সনাক্ত করতে ভয় পায় আমি তাকে ঘৃণা করি- যে ভাই এখনও নির্লজ্জ স্বাভাবিক হ...

পাঠক-প্রিয়